শনিবার,   ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ,   সকাল ৯:৩৭,  ৭ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং
Home আইনশৃঙ্খলা জঙ্গিদের মূল মুফতি হান্নান ও সহযোগী বিপুল-রিপনের ফাঁসি কার্যকর

জবাবদিহি প্রতিবেদক ঃ
পাকিস্তানি ও আফগান জঙ্গিদের কায়দায় বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটানোর ওস্তাদ আবদুল হান্নান ওরফে মুফতি হান্নান ও তার ২ সহযোগীর ফাঁসি বুধবার রাতে কার্যকর করা হয়েছে । ১ যুগ আগে সিলেটে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ৩জনকে হত্যার দায়ে এই ৩জনের ফাঁসি দেওয়া হলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গণমাধ্যমকে জানান, বুধবার রাত ১০টায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ শাহেদুল বিপুলকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

একই সময়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের আরেক সহযোগী দেলোয়ার হোসেন রিপনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া জানান।

উল্লেখ্য, হান্নান ও তার দলের জঙ্গিরা ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ওই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে।

ওই ঘটনায় আনোয়ার চৌধুরী প্রাণে বেঁচে গেলেও ২ পুলিশ সদস্যসহ ৩জন নিহত হন। সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ অন্তত ৪০জন আহত হন সেদিন।

ওই হত্যাকাণ্ডের দায়ে হান্নান, বিপুল ও রিপনের মৃত্যুদণ্ডের রায় সর্বোচ্চ আদালতেও বহাল থাকে। সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ করে আপিল বিভাগ বলে, “তারা যে অপরাধ করেছে তা পূর্বপরিকল্পিত একটি অপরাধ। ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ ও তার সফরসঙ্গীদের হত্যা করার জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছিল। এ অভিযোগের দায় থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া যায় না।”

আদালতের ওই রায় এমন এক দিনে কার্যকর হল, যখন বাংলাদেশের মানুষ বৈশাখ বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ওই বর্ষবরণের উৎসবেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত হন ১০জন।

সেই মামলাতেও নিম্ন আদালতে মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় এসেছে। রায়ের বিরুদ্ধে তার করা আপিলের ওপর শুনানি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে হাই কোর্টে।

বলা হয়, বিশ শতকের শেষ বছর যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে হরকাতুল জিহাদের বোমা হামলার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সূচনা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ হরকাতুল জিহাদের ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পেছনে মূল ব্যক্তি হিসেবে মুফতি হান্নানকে দায়ী করা হয়।

শেখ হাসিনার নিজের জেলা গোপালগঞ্জেই মুফতি হান্নানের বাড়ি৷ পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে তার জঙ্গিবাদে হাতেখড়ি। আফগানিস্তান সীমান্তে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

আর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তার দুই সহযোগীর মধ্যে শরীফ শাহেদুল বিপুলের বাড়ি চাঁদপুর সদরে; দেলোয়ার হোসেন রিপনের বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়।

সিআইডি অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক আব্দুল কাহার আকন্দ গতবছর বিবিসিকে বলেন, “হান্নানের বিশেষত্ব হল- তিনি আফগান স্টাইলে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার তৎপরতা চালচ্ছিলেন। প্রথমে দেশি বোমা ব্যবহার করলেও পরে পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করেন। এছাড়া বোমা বানানো এবং আক্রমণ বিষয়েও তার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে এবং এ নিয়ে প্রশিক্ষণও দিতেন তিনি।”

২০০৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।১৭ মামলার আসামি হান্নান ও তার সহযোগীদের মুক্ত করতে গত ৬ মার্চ টঙ্গীতে প্রিজন ভ্যানে হামলার ঘটনাও ঘটে।

এ মামলা সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা হলো।

# সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলায় তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় ২০০৪ সালের ২১ মে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।

# তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ৭ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, তার ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

# যথাযথ ঠিকানা না থাকায় মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজার নাম প্রথমে বাদ দেওয়া হলেও পরে তাকে যুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ওই বছর নভেম্বরে হয় অভিযোগ গঠন।

# ৫৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

# ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মুত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ। তাতে আসামিদের আপিল খারিজ হয়ে যায়, মুফতি হান্নানসহ ৩ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং ২ জনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল থাকে।

# ওই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন হান্নান ও বিপুল। আর দেলোয়ারের পক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়েও ওই ৩ আসামির সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।

# আপিল বিভাগের রায় হাই কোর্ট হয়ে নিম্ন আদালতে যাওয়ার পর বিচারিক আদালত মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে এবং তা গত ৩ ফেব্রুয়ারি কারাগারে পৌঁছায়। সেখানেই আসামিদের মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়।

# আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামি রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন। তাদের আবেদন গত ১৯ মার্চ সর্বোচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে যায়।

# প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় সাংবিধানিক অধিকারের সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন ৩ জঙ্গি। তাদের সেই আবেদন নাকচ হয়ে গেছে বলে ৯ এপ্রিল সাংবাদিকদের জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

# মুফতি হান্নানের পরিবারের সদস্যরা বুধবার সকালে এবং রিপনের স্বজনরা সন্ধ্যায় কারাগারে গিয়ে ওই ২ জঙ্গির সঙ্গে শেষ দেখা করেন। বিপুলের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলেও তারা কারাগারে যাননি।

# সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে কারাবিধি মেনে বুধবার রাতে কাশিমপুরে হান্নান ও বিপুল এবং সিলেট কারাগারে রিপনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

Leave a Reply